

নোমান মাহফুজ:: শায়েখ মাওলানা আব্দুল জলিল রাহিমাহুমুল্লাহ। যিনি এলাকায় শায়খে ভাদেশ্বরী বা শেখ সাব হিসেবে পরিচিত। গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে ১৯৪০ ইং সনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আসাহিদ আলী ও মাতার নাম রফিজা বেগম। তিনিসহ ৫ ভাই, ৪ বোন। ভাইদের মধ্যে তৃতীয়। এবং বিবাহিত জীবনে ৫ ছেলে ও ৪ মেয়ের জনক।
তিনি ছিলেন আল্লামা শায়েখ লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ. এর খাস ও আল্লামা আব্দুল মতিন শায়খে ফুলবাড়ি রহ. এর বিশেষ খেলাফতপ্রাপ্ত।
প্রাথমিক শিক্ষা পারিবারিক ও স্থানীয় পাঠশালায়। পরে দ্বীনি শিক্ষার আগ্রহ নিয়ে ভর্তি হন মিরগঞ্জ মাদরাসায়। সেখান থেকে জামিয়া ক্বাসিমুল উলুম মেওয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। অতপর জামিয়া মাদানীয়া আঙ্গুরা মোহাম্মদপুর মাদরাসায় আলিয়া ছুওম পর্যন্ত পড়ে জামিয়া ইসলামিয়া তাঁতিবাজার ঢাকা থেকে দাওরায়ে হাদীস শেষ করেন।
লেখাপড়া শেষ করেই ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কঠালপুরস্থ আমিরগঞ্জ মাদরাসা প্রতিষ্টা করে দ্বীনি খেদমত শুরু করেন। পরে সেখান থেকে চলে এসে ফেঞ্চুগঞ্জ মুজাহিরুল উলুম খিলপাড়া মাদরাসা নামে একটি কওমি মাদরাসা প্রতিষ্টা করেন। এরপর চলে যান প্রবাসে। প্রবাসে থেকেও মুহিউসসুন্নাহ সুনাপুর মাদরাসা প্রতিষ্টা করেন। এছাড়া গোলাপগঞ্জের পশ্চিম নিশ্চিন্ত জামে মসজিদ সহ বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি করেন। ৮/৯ বছরের প্রবাস জীবনে তিনি জিদ্দা গুলিল মসজিদে আব্দুল্লাহ ইবনে মসউদ এ সানী ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত তিনি ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে দ্বীনি প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। আমল আখলাকের ক্ষেত্রে তিনি আমাদের জন্য অনুস্মরণীয়। একজন খালিস আল্লাহর ওলী। আধ্যাত্মিকতার জগতে সিলেটের বিভিন্নস্থানে তার অনেক মুরিদান রয়েছেন।
তার উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম হলেন শায়খুল হাদীস আবু বকর রহ. ঢাকা, মাওলানা মজফফর হোসাইন রহ., মাওলানা শিহাব উদ্দিন রহ. আঙ্গুরা, মাওলানা খলিলুর রহমান পাতনী, মাওলানা আব্দুল খালিক দেউলগ্রাম।
ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাওলানা নজির আহমদ নাজিমে তা’লীমাত বারইগ্রাম মাদরাসা, মাওলানা আব্দুল মজিদ রহ. খিলপাড়ি, মাওলানা আব্দুর রহিম ইলাশপুরী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। (উল্লেখ্য: শায়েখ মাওলানা আব্দুল জলিল রাহিমাহুমুল্লাহ আমার (লেখক) নানা। উপরের তথ্যসব ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে নানাজীর জবান থেকে শুনে লেখা)
নানাজীর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত ছেলে মেয়েদের ঘরে যেসকল নাতি নাতনীদের রেখে যান তারা হলেন বড় মেয়ের ঘরে নোমান মাহফুজ, সালমা বেগম রাহিমাহাল্লাহু, মুফতি ফয়জুল হাসান, মাওলানা হুসাইন আহমদ, হাফিজ আসআদ আহমদ, আলেমা হাফসা বেগম, আজহার আহমদ ও ইশরাত জাহান উমামা। দ্বিতীয় মেয়ের ঘরে বুশরা, তায়্যিবা, রাশেদ, তাবাসসুম, রাহাদ, তানিশা। তৃতীয় মেয়ের ঘরে একমাত্র নাতি মুহিউল ইসলাম মারজান। বড় ছেলের ঘরে গালিব, লাবিব। দ্বিতীয় ছেলের ঘরে সুমাইয়া, উসামা, হুমায়রা । তৃতীয় ছেলের ঘরে কোন সন্তান ছিলো না। আর চতুর্থ ছেলের ঘরে সন্তান ছিলো না, তবে উনার ইন্তেকালের কয়েকমাস পরে পৃথিবীর আলো দেখেন।
বৈবাহিক জীবনে শায়েখ ভাদেশ্বরীর দু’জন স্ত্রী ছিলেন। প্রথম বিবাহ করেন হাওরতলায় আর দ্বিতীয় বিয়ে করেন ফেঞ্চুগঞ্জের খিলপাড়ায়। দু’জনেই বেঁচে আছেন। আল্লাহ তায়ালা নেক হায়াত দান করুন। প্রথম স্ত্রীর ঘরে ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে আর দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে ১ ছেলে ও ১ মেয়ে। তিনি ফখর করতেন নাতি নাতনীদের নিয়ে! বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজে গিয়ে বলতেন আমার নাতি নাতনীরা হাফিয মাওলানা। তাদের এই যোগ্যতা, সেই যোগ্যতা। এই মেধা, সেই মেধা।
ছিলেন সহজ সরল স্বভাবের। কখনো কাউকে কষ্ট দিয়েছেন বলে মনে হয় না। গাম্ভীর্যের সাথে চলতেন। কথা বলতেন। বয়ানের মঞ্চে প্রিয় শায়েখ বর্ণভী রহঃ এর সুরে আমলী বয়ান করতেন। দোয়ায় নিজে যেমন কাঁদতেন তেমনি কাঁদাতেন। আরবি ফারসি শের পড়ে দোয়া করার যোগ্যতা ছিলো প্রখর। বয়ান করে বলে বেড়ানো তার স্বভাবের বিপরীত ছিলো। অমুক দল তমুক দলের নেতা সদস্য বলে প্রচার করা তার মেজাজের খেলাফ ছিলো। তাকে নিয়ে কেউ অতি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যাক, তা কখনো পছন্দ করতেন না। সর্বদা ঈমান আখলাকের ক্ষেত্রে আড়ালে থাকাটাই ছিলো তার পছন্দ! মৃত্যুর পূর্বে তিনি দীর্ঘ কয়েক মাস জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ভাদেশ্বর ইউপি শাখার সভাপতি ও তার পূর্বে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ পরিবারের কেউ জানতেন না। ভাদেশ্বরের মীরগঞ্জে একটি মাদরাসার উদ্বোধন করেছেন তাও কেউ জানতো না। আহ! তিনি! কতই না প্রচার বিমুখ আলেম ছিলেন। ছিলেন ফারসি শে’রের মজনু! সুযোগ পেলেই গাইতেন। তরজমা করতেন। কাঁদতেন। কাঁদাতেন। হাসতেন। হাসাতেন।
মনে পড়ে ছোটবেলার স্মৃতি। তাহাজ্জুদ আদায় করা। জিকির করা। আজান হলে উচ্চস্বরে ডেকে ডেকে মসজিদে যাওয়া। বাদ ফজর তেলাওয়াত করা। আজো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রিয় শায়খের লেহজে যখন টান দিয়ে মুনাজাত করতেন, সেই ছোটকালেও মনকাড়তো! আমলওয়ালা হও, এটাই তার সবক থাকতো। তার আমলের পরিধি কতো সুন্দর ছিলো, তবুও কথায় কথায় বলতেন। আল্লাহর দরবারে কী জবাব দিবো। নিজের জন্য কিছুই করতে পারলাম না বলে আফসোস করতেন। তার এ মেজাজ থেকে একটা শিক্ষাই পাওয়া যায়, আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত ওলীরা কখনো নিজেকে বড় মনে করেন না।
ইন্তেকালের ইতিকথা!
শুক্রবার। ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২২। তখন সকাল ৮টা। নানাবাড়ি থেকে কল আসলো। নানাজীর শারীরিক অবস্থা খুব ভালো নয়। শ্বাস বেড়েছে আর পা দুটি ঠান্ডা হয়ে আসছে। বুঝতে বাকি রইলো না যে তিনি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের কঠিন পরীক্ষায়। আম্মা খালাকে বললাম পাশে বসে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করতে। আমি তখন বাড়িতে। ১২টার দিকে নানাবাড়ি পৌঁছে নানাজীর অবস্থা দেখে মাথার পাশে বসে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত শুরু করি। যেহেতু শুক্রবার দিন। নামাজের সময় সন্নিকটে। তাই সবাইকে সাথে নিয়ে মোনাজাত করি। আত্মীয়স্বজনরাও খবর পেয়ে চলে আসছেন। আম্মা খালাকে ইয়াসিন পড়ার তাগিদ দিয়ে নামাজে চলে যাই। নামায শেষে তাড়াতাড়ি চলে আসি। মানুষজনও দেখতে আসছেন। এবার দেখলাম সচল ডান হাতটাও অচল। উল্লেখ্য, তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। ফলে বাম সাইট একেবারে অবস ছিলো। নানাজীর পাশে বসে আবার সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করতে বসলাম। কয়েকবার তেলাওয়াতের পর বড় মামা সবাইকে নিয়ে মোনাজাত করলেন। আবার পড়া শুরু করলাম। আমার পিছনে ছোটবোন বসে তেলাওয়াত করছে। অন্যপাশে আম্মা, খালা, মামা মামি সহ সব বসা। যে যার মতো করে পড়ছেন। খেয়াল করে দেখলাম নানাজীর শ্বাসকষ্টটা থেমে আসছে। শরীর ঘামছে। বারবার মুছে দেয়া হচ্ছে। ঘড়ির কাটায় তখন ২:১৫ মিনিট। শ্বাসকষ্ট একেবারে বন্ধ। দুই ঠোঁট নড়ছে। এমন সময় নানাজীর বুকের মধ্যে হাত রাখলাম। সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত তো চলছেই। মাত্র তিনটা ঢেকুর উঠলো। আমি সাথে সাথে উনার বুকে মাথা রাখলাম। বুঝতে অসুবিধা হলো না। তিনি ৮১ বৎসরের জিন্দেগী শেষে তার স্বীয় মাওলায়ে হাক্বীক্বীর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। সাথে সাথে পড়লাম ”ইন্না—লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”! ইন্তেকালের পর নানাজীর চেহারায় উজ্জ্বলতার রেখা ফুটে উঠলো। তিনি যেন হাসিমুখে দুনিয়ার সফর সমাপ্ত করলেন।
ইন্তেকালের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে মানুষজন ছুটে আসেন। অশ্রুসিক্ত প্রতিজনের চোখ। নক্ষত্রের খসে পড়ায় সকলের হৃদয়ে ব্যাথার যন্ত্রণা! আহ, কি ধন হারালাম আমরা। কাফন দাফন সম্পন্ন করার ইন্তেজাম চলছে। রাত সাড়ে ৮টায় জানাযা। সিদ্ধান্ত হলো জানাযার নামাজের ইমামতি করবেন নানাজীর অত্যন্ত মহব্বতের ভাতিজা, হাজারো হাফিয গড়ার কারিগর হাফিজ ছলিম আহমদ মামা। আসরের নামাজের পর কাটাখালিপার ও জামিয়া রহমানিয়া ভাদেশ্বরের ছাত্র শিক্ষক নানাকে দেখতে এসে কুরআন শরীফের খতম পড়েন। নানাজীর মুহিব্বিন মুতাআল্লিকিনরাও আসতে থাকেন। পরিরবার ও স্বজন সবাই কান্নাকাটি করছেন। নিজেকে ধৈর্যের সাথে বেঁধে সবাইকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি। এশার সময় ঘনিয়ে আসছে। আম্মা খালা নানুদের নিয়ে শেষমেশ মুনাজাত করলাম। আহ! কান্নাকাটি আর আক্ষেপ! আগত মেহমানদের জন্য খানার ব্যবস্থা সহ যাবতীয় প্রয়োজন যেন আপনাআপনি হয়ে গেছে। এতো মানুষের সমাগম। পুরো বাড়ির বিভিন্ন ঘর থেকে বারবার চা—টার মাধ্যমে যেভাবে খেদমত করা হয়েছে তা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। এশার আযান হয়ে গেলে শেষবারের মতো সকলে একনজর নানাজীর মুখ দেখে চিরবিদায় জানান। এশার নামাজের পর জানাযা পূর্বে উপস্থিত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে কথা রাখেন মাওলানা মুখতার আহমদ, নানাজীর প্রথম স্নেহময় ছাত্র মাওলানা নাজির আহমদ সহ উলামায়ে কেরাম। পরিবারের পক্ষে কথা বলেন বড় মামা হাফিয আব্দুল্লাহ আল মামুন। জানাযায় এতো মানুষের সমাগম ঘটবে কে জানতো! আশ্চর্যের অবাকময় পরিবেশ ঘটেছে ভাদেশ্বরের মাঠ ঘাটে। ভাটাটিকর জামে মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহে জানাযা শেষে মোকামটিলায় দাফন সম্পন্ন করা হয়। প্রিয় নানাজীর দাফন শেষে সকলকে সাথে নিয়ে তেলাওয়াত ও মুনাজাত করে বাড়িতে ফিরে আসি। রাতে বাড়িতে চলে আসি। যেহেতু মসজিদের দায়িত্ব আছে। রবিবারে আবার নানাবাড়ি যাই ছেলে ও আহলিয়াকে নিয়ে। নানুর ইচ্ছা তারা সেখানে থাকুক। তাই তাদেরকে রেখে বাড়িতে চলে আসি। চলে আসার পূর্বে সবাইকে নিয়ে মোনাজাত করি। আমাকে জড়িয়ে ধরে নানু খালার কান্না। এদিন নানা—হীন নানাবাড়ি ছিলো বেদনার চাপা আর্তচিৎকারে বেষ্টিত এক নতুন কোন নানাবাড়ি! পরদিন দোয়া ও শিন্নীর আয়োজন করা হয়েছে। তাই পরদিন সোমবার আবার যাই। দোয়া ও শিন্নীতে শরীক হই। চলছে খানাপিনা। সবাই খাচ্ছেন। যারযার মতো চলেও যাচ্ছেন। হঠাৎ মনটা এতোটা বিষাদে ভরলো যে, মনকে কোনভাবে শান্ত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। শেষমেশ ছোট খালার পিড়াপিড়িতে খেতে হলো। কষ্টের সমীরণ বেড়েই চলেছে।সবাইকে আমি শান্ত রাখার চেষ্টা করে এই আমি যদি অশান্ত হই। কেমন লাগে ভেবে ভিতরের চাপা আর্তচিৎকারকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করি। সারাদিন থেকে মাগরিবের নামায পড়ে আবার বাড়িতে চলে আসি। আর যতো জীবন বাঁচবো নানা—হীন নানাবাড়ি থাকবে। আর কখনো শুনবো না উর্দু ফার্সি শের আর দোয়া। নসিহতমূলক ঈমানী বয়ান, উলামায়ে কেরাম ও ইসলামের বীরত্ব গাঁথা মুক্তোর মতো কাহিনী। নিতে পারবো না দোয়া। এসকল দরোজা বন্ধ হয়ে গেলো চিরতরে! আল্লাহ তুমি আমার নানাকে মাগফিরাত দান করো। কবরকে জান্নাতুল ফেরদৌসের টুকরা বানাও। তার রুহানি ও দ্বীনি ফয়েজ আমাদেরকে দান করো।
লেখক: পরিচালক— বায়তুল আমান সাবাহি মক্তব, নিশ্চিন্ত, গোলাপগঞ্জ, সিলেট। মোবাইল: ০১৭৮৯—২২৫৪৪৬
আপনার মতামত লিখুন :