

আজ ঐতিহাসিক ২৫ মে : শায়খুল হাদীস আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরী (রহ.) এর ওফাত দিবস
নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ ২৫ মে উপমহাদেশের প্রখ্যাত শায়খুল হাদীস, উস্তাযুল মোহাদ্দিসীন, যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরী (রহ.) এর ওফাত দিবস। ১৯৯০ সালের এই দিনে তিনি হাজারো ছাত্র, ভক্ত, মুরিদ ও তাওহিদী জনতাকে শোকাহত করে মহান রবের সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। সিলেটসহ সমগ্র উপমহাদেশের আলেম সমাজে তিনি “ছখরীয়ার ছাব” নামে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।
সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চৌঘরী গ্রামে ১৯০০ ইংরেজি সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান মনীষী। তাঁর পিতা মরহুম মামন হাজ্বী এবং মাতা মোছাম্মত রহিমা বেগম ছিলেন অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেজগার। শৈশবেই পিতাকে হারানোর পর বড় ভাই মরহুম সাজীদ আলীর তত্ত্বাবধানে তিনি বেড়ে ওঠেন।
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ফুলবাড়ী আজিরিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চতর হাদীস শিক্ষার জন্য তিনি উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। সেখানে তিনি শায়খুল হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.), আল্লামা শব্বীর আহমদ উসমানী (রহ.) সহ বহু প্রখ্যাত আলেমের সান্নিধ্যে ইলমে দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি দ্বীনি খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। ফুলবাড়ী আজিরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, ঝিংগাবাড়ী মাদ্রাসা এবং ভারতের হাইলাকান্দির বড়বন্দ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে তিনি ইলমে দ্বীনের ব্যাপক খেদমত আঞ্জাম দেন। তাঁর ইলমী গভীরতা, তাকওয়া ও আধ্যাত্মিকতা দ্রুত সর্বমহলে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
১৯৩০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী ঢাকাউত্তর রানাপিং আরাবিয়া হুসাইনিয়া মাদ্রাসা। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠান সিলেট অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বিশেষ করে সিলেটে সর্বপ্রথম দারুল হাদীস চালুর কৃতিত্বও তাঁর নেতৃত্বাধীন রানাপিং মাদ্রাসার।
নারী শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৮২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “রিয়াছতুল উলুম মাদরাসাতুল বানাত” নামে সিলেটের প্রথম মহিলা টাইটেল মাদ্রাসা। তাঁর এই দূরদর্শী উদ্যোগ পরবর্তীতে সারাদেশে মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও সক্রিয়। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, মুসলিম পারিবারিক আইন বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইসলামি ও গণআন্দোলনে তিনি সাহসী নেতৃত্ব দেন। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
১৯৭৭ সালে কুখ্যাত কবি দাউদ হায়দারের ইসলামবিদ্বেষী লেখার বিরুদ্ধে তিনি গোলাপগঞ্জে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন। নবী করীম (সা.) এর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থান তাওহিদী জনতার মাঝে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও সাদাসিধে জীবনযাপন করেন। নিজের বাড়িতে দালান নির্মাণ না করে মাদ্রাসার উন্নয়নে সবকিছু ব্যয় করেন। ছাত্রদেরকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন এবং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৯০ সালের ২৫ মে শুক্রবার রাত ৩টা ২০ মিনিটে নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন। বাদ আছর রানাপিং মাদ্রাসা মাঠে হাজার হাজার আলেম, ছাত্র, মুরিদ ও তাওহিদী জনতার উপস্থিতিতে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর সুযোগ্য সন্তান মাওলানা ঈসমাইল আলী (রহ.) জানাজার ইমামতি করেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
আজ তাঁর ওফাত দিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভক্ত-অনুরাগীরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছেন এই মহান বুযুর্গ, মুজাহিদ ও ইসলামী শিক্ষার অগ্রদূতকে।
মহান আল্লাহ তায়ালা যেন শায়খুল হাদীস আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরী (রহ.)-কে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন এবং তাঁর ইলমী ও রুহানী ফয়েজে উম্মাহকে উপকৃত রাখেন—এ কামনা সর্বস্তরের মুসলমানদের। আমিন।
আপনার মতামত লিখুন :