

সিলেটের সঙ্গে কোরাবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ বর্জনের কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে শুরু করেছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কওমি মাদরাসা। চামড়া শিল্পের সংকটের মধ্যেই এ কর্মসূচি বড় দুঃসংবাদ। দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে এই ‘নীরব বিদ্রোহের’ ঘোষণা দিয়েছে দেশের শীর্ষ কওমি মাদরাসা ভিত্তিক সংগঠন ‘কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’।
এদিকে, স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন বাজারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাম নির্ধারণ, বকেয়া টাকা না পাওয়া, কওমি মাদরাসারগুলোর চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এখন ব্যবসা করবেন কিনা তা নিয়েই শঙ্কিত তারা।
শাহজালাল (রহ.) চামড়া সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘চামড়ার দর পতনের কারণেই এ ব্যবসায় আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সিলেটে আগে প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী এ ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। এখন মাত্র ৫০জন হবে ঠিকে আছেন। তাদেরও অনেকেই এবার ব্যবসা করবেন না বলে জানিয়েছেন।’
কওমি মাদরাসা যদি চামড়া সংগ্রহ না করে তাহলে ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের চামড়া ব্যবসায় সঙ্গে জড়িত লোকবল অনেক কম।
সিলেট জেলায় এ বছর লক্ষাধিক পশু কুরবানি হতে পারে। এসব পশুর চামড়া বেশির ভাগই সংগ্রহ করে কওমি মাদরাসাগুলো। এখন তারা যদি চামড়া সংগ্রহ না করে তাহলে ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দিতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চামড়া যেহেতু সংগ্রহ করতে হয়। তাই এ চামড়া সংগ্রহে যে জনবল প্রয়োজন তা সরবরাহ করা প্রশাসন কিংবা ব্যবসায়ী কারো পক্ষেই সম্ভব না।’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই নানান সুযোগ সুবিধার কথা বলা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সুযোগ সুবিধার বুলি প্রতিবারই শোনানো হয়। ঈদের দিন পার হলেই কেউ কাউকে চিনে না। এবার আমরা একটা স্থায়ী সমাধান চাই। হয় আমাদের বকেয়া টাকা উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, না হয় আমাদের চামড়া রপ্তানির জন্য অনুমতি দেওয়া হোক।’
তবে কওমি মাদরাসাগুলোর সঙ্গে প্রশাসন থেকে এখনও কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে জানিয়েছেন ‘কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ এর সদস্য সচিব মাওলানা মুশতাক আহমদ খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। আমাদের দাবি মানবিক। চামড়া থেকে আমাদের লক্ষাধিক মাদরাসার আয়ের বড় অংশ আসে। নায্য মূল্যে চামড়া বিক্রির নিশ্চয়তা না পেলে আমাদের দাবিতে আমরা অনড় থাকবো ইনশাহ আল্লাহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে যারা চামড়া ব্যবসা করেন তারাই নায্য মূল্য পান না। তাদের টাকাও বকেয়া থাকে। তাহলে সরকার যে প্রতিবছর অনুদান প্রণোদন ও ঋণ দিচ্ছে তা যায় কোথায়? এ সমস্যা সমাধানে সরকারের সদিচ্ছা একান্ত প্রয়োজন। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত।’
এ কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ে হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই কর্মসূচিকে মানবিক দাবি হিসেবেই দেখার অনুরোধ করছি। ইতোমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু মাদরাসা থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং এ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমাদের সাধুবাদ জানিয়েছেন। অনেকে তাদের মাদরাসা থেকেও কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করবেন না বলে আমাদের জানিয়েছেন।’
‘কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ এর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সিলেট বিভাগের কওমি মাদরাসাগুলো এবার কোনো ধরনের কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করবে না। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রথম সারির বেশ কিছু কওমি মাদরাসাও চামড়া সংগ্রহ না করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের আলেম-ওলামা ও মাদরাসা শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আসন্ন ঈদের আগে কওমি মাদরাসাগুলোর পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে এই বর্জনের ঘোষণা আসতে পারে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ষড়যন্ত্র ও অকার্যকর সিদ্ধান্ত’, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘ব্যর্থতা’ এবং বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ‘উদাসীনতা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবকে’ দায়ী করে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শীর্ষ কওমি শিক্ষাবোর্ড ও মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা।
কওমি মাদরাসাগুলোর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশের চামড়া শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা। কারণ, দেশে বছরে উৎপাদিত মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৬০ শতাংশই সংগৃহীত হয় কুরবানির ঈদে, যার সিংহভাগ আসে মাদরাসার মাধ্যমে। উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে হতাশা থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
অন্যদিকে, চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করলে কাঁচামাল সংকটে ট্যানারি শিল্প স্থবির হয়ে পড়বে এবং সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক হারে চামড়া পাচারের ঝুঁকি তৈরি হবে।
কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরজুড়ে সর্বসাধারণের দান, মৌসুমী চাঁদা এবং কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি থেকে অর্জিত আয়ই কওমি মাদরাসা ও এর আওতাধীন লিল্লাহ বোর্ডিং (এতিমখানা) পরিচালনা এবং অবহেলিত এতিম শিশুদের ভরণপোষণের প্রধান উৎস। কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই আয়ের খাতটি পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
রাজধানীর জামিয়া আরাবিয়া নতুনবাগ মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান জানান, ‘২০১৩ সাল থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদরাসার এই আয়ের উৎস বন্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে চামড়ার বাজারে দরপতন ঘটায়। ফলস্বরূপ, এক সময়ের ‘নগদ সোনা’ খ্যাত কুরবানির চামড়া শেষ পর্যন্ত মূল্যহীন পণ্যে পরিণত হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চামড়া সংরক্ষণের জন্য মাদরাসায় কাঁচা লবণ সরবরাহ করলেও, মূল সিন্ডিকেট না ভাঙায় তা অযৌক্তিক ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, গত বছর চামড়া বিক্রি করেও লবণ কেনার টাকাও ওঠেনি।’
মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের মূল অভিযোগ বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চামড়া শিল্পের সুদিন ফিরবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত ‘১৮০ দিনের অগ্রাধিকার প্রকল্প’ বা ‘১০০ দিনের সংস্কার কর্মসূচির কোনোটিতেই চামড়া শিল্প নিয়ে কোনো রূপরেখা বা দূরদর্শী পরিকল্পনা নেই। আগের সেই শক্তিশালী বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভাঙতেও কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সার্বিক এই বঞ্চনা ও চরম হতাশা থেকেই আগামী কুরবানির মৌসুমে দেশব্যাপী চামড়া সংগ্রহ না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন তারা।
এদিকে কওমি মাদরাসাগুলোর এমন ঘোষণায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। গত শুক্রবার বিকেলে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের আয়োজনে ৪৭তম বিভাগীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বয়স মাত্র আড়াই মাস। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে চামড়া বাজারের মতো একটি খাতের আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কাজ পুরোদমে চলছে। বাংলাদেশ একদিন চামড়া শিল্প থেকে বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করবে। তবে এর জন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সরকারগুলোর ভুল নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে এই খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা এটি ভাঙতে বদ্ধপরিকর। আমি কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করব, তারা যেন হতাশা থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন এবং জাতীয় স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করেন। প্রয়োজনে মাদরাসা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমরা দ্রুতই জরুরি বৈঠকে বসব।’
কওমি মাদরাসার এই বর্জনের ডাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছেন চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)-এর একজন শীর্ষ নেতা বলেন, ‘মাদাসার ছাত্র-শিক্ষকরা তৃণমূল পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহ না করলে সাধারণ মানুষ চামড়া কোথায় রাখবে? চামড়া দ্রুত লবণজাত করতে না পারলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা পচে নষ্ট হয়ে যাবে। এতে ট্যানারিগুলো কাঁচামালের তীব্র সংকটে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের বিলিয়ন ডলারের চামড়া রপ্তানি খাতে।’
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করলে কাঁচা চামড়ার দাম জিরোতে নেমে আসবে। এই সুযোগে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে কোটি কোটি টাকার চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে কুরবানির চামড়ার মূল্য পতন দেশের অর্থনীতিতে একটি কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। ২০১৩ সালেও যে গরুর চামড়া প্রতিটি ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হতো, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তা নেমে আসে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। অনেক স্থানে দাম না পেয়ে ক্ষুব্ধ মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছেন কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট এবং বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার সংস্কৃতিই এই ধসের জন্য দায়ী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যদি অবিলম্বে কওমি মাদরাসাগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে এবং কাঁচা চামড়া সংগ্রহের জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিকল্প কোনো ‘ব্যাক-আপ প্ল্যান’ তৈরি না করে, তবে আগামী কুরবানির ঈদে চামড়া শিল্পে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে সরকার এবং মাদরাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্রুত একটি সমঝোতা ও কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
আপনার মতামত লিখুন :