ইতেকাফে বসার আগে যেসব বিষয় জেনে নেওয়া জরুরি


admin প্রকাশের সময় : মার্চ ৯, ২০২৬, ১৭:৪৫ /
ইতেকাফে বসার আগে যেসব বিষয় জেনে নেওয়া জরুরি

২০ রমজান মোতাবেক ১০ মার্চ ইফতারের আগেই মসজিদে গিয়ে উপস্থিত হবেন রোজাদার মুসলমান। এ ইতেকাফ কী? কেন ইতেকাফে বসবেন রোজাদার? ইতেকাফের শর্ত ও তথ্যগুলো কী? ইতেকাফে বসার আগে যে বিষয়গুলো জেনে নেওয়া জরুরি, সেসবের কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো—

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রমজানের নিয়মিত আমল হলো ইতেকাফ। তিনি রমজানের শেষ দশ দিন এ ইবাদত করতেন। এ দশকে লাইলাতুল কদর পাওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইতেকাফ অনেক জরুরি বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমৃত্যু ইতেকাফ করে গেছেন।

ইতেকাফ কী?

ইতেকাফ শব্দের হলো আঁকড়ে ধরা অর্থাৎ উদ্দেশ্য হাসিলের নিমিত্তে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রতি মনকে আবদ্ধ রাখা। ইসলামি শরিয়তে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মসজিদে অবস্থান করাকে ইতেকাফ বলে।

ইতিকাফে বসবেন কেন?

আগের সব নবি-রাসুলগণ ও তাদের উম্মতগণ শ’ কিংবা হাজার বছর হায়াত (জীবন) পেয়েছেন। তারা বছরের পর বছর আল্লাহ ইবাদাত-বন্দেগিতে কাটাতেন। সে হিসেবে আল্লাহ তাআলা আমাদের অল্প আয়ু বা জীবনকাল দিয়েছেন। তাই মহান আল্লাহ তাআলা উম্মাতে মুহাম্মাদির জন্য দান করেছেন মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর। যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যা রমজানের শেষ দশকের যে কোনো এক বেজোড় রাতে সংঘঠিত হয়। ইতেকাফকারীদের অধিকাংশেরই এ রাতটি পাওয়ার সৌভাগ্য হয়ে থাকে।

এ কারণেই মুসলিম উম্মাহ রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর পাওয়ার আশায় ইতেকাফে বসেন। ইতেকাফে বসা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلاَ تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ

‘আর যখন তোমরা মসজিদ ইতিকাফে বসো তখন স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা; এর ধারে কাছেও যেও না।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১২৭)

ইতিকাফে বসার অর্থই হচ্ছে, রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে অবস্থান করা এবং এই দিনগুলোকে আল্লাহর জিকিরের জন্য নির্দিষ্ট করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) দুনিয়ার জীবনে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করে গেছেন। (বুখারি, মুসলিম)।

ইতেকাফের গুরুত্বপূর্ণ মাসায়িল

১. মুমিন বান্দাদের জন্য ২০ রমজান সূর্যাস্তের আগে অর্থাৎ ইফতারের আগেই ইতেকাফের নিয়তে মসজিদে উপস্থিত হওয়া আবশ্যক।

২. ইতেকাফের জন্য নিয়ত করা আবশ্যক। এক সঙ্গে দশদিনের জন্য নিয়ত না করলে সুন্নত ইতেকাফ আদায় হবে না, বরং তা নফলে পরিণত হবে।

৩. মাসনুন ইতেকাফের নিয়ত করলে অবশ্যই তা পূর্ণ করা আবশ্যক। ওজর ব্যতিত তা ভঙ্গ করা বৈধ নয়।

৪. ইতেকাফকারীর জন্য ইতেকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা হারাম। এমনকি স্ত্রীকে চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করাও বৈধ নয়।

৫. মাসনুন ইতেকাফ শুরু করার পর কোনো ব্যক্তির যদি দু’একদিন ভঙ্গ হয়ে যায়, তখন ভঙ্গ দিনের ইতেকাফ পরে কাযা করে নিতে হবে।

৬. পারিশ্রমিক বা ইফতার-সেহরির বিনিময়ে ইতেকাফ করা ও করানো কোনোটিই বৈধ নয়।

৭. ইতেকাফকালীন সময়ে কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল করা, দ্বীনি মাসআলা-মাসায়েল আলোচনা করা, নিজের শিক্ষা অর্জন করা এবং অন্যকে শিখানো উত্তম এবং বৈধ।

৮. ইতেকাফে বসে চুপচাপ থাকাকে ইবাদাত-বন্দেগি মনে করলে সে চুপচাপ থাকা ইতেকাফ মাকরূহ হবে। তবে মুখের গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাকতে চুপ থাকাও অনেক বড় ইবাদাত।

৯. ইতেকাফের স্থানকে ব্যবসাস্থল বানানো মাকরূহ। ওয়াজিব ইতেকাফ ফাসিদ বা বাতিল হয়ে গেলে তার কাযা আদায় করা ওয়াজিব। ইতেকাফকারী নিজের কারণে ফাসিদ/বাতিল হোক অথবা হায়েজ (ঋতুস্রাব) বা নিফাসের (রক্তস্রাব) কারণে বাতিল হোক। পরবর্তীতে তা আদায় করা ওয়াজিব।

১০. নারীরা নিজেদের ঘরে ইতেকাফের স্থানকে কাপড় দিয়ে পর্দা টেনে নিবে, যাতে বেগানা পুরুষসহ যে কেউ আসলে ইতেকাফের স্থান ত্যাগ না করতে হয়।

রমজানের ইতেকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত। রমজানের বাইরে অন্য সময় ইতেকাফের জন্য রোজা শর্ত নয়। রমজানে শেষ দশ দিন ইতেকাফ করা। ন্যূনতম শেষ তিন দিন ইতেকাফ করা। রমজানের বাইরে ইতেকাফের নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ নেই।

ইতেকাফ সহিহ হওয়ার শর্ত—

১. মুসলমান হওয়া;

২. জ্ঞানবান হওয়া; প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া ইতেকাফের জন্য শর্ত নয় বরং জ্ঞানবান নাবালিগের জন্যও ইতেকাফ সহিহ হবে।

৩. জানাবাত (অপবিত্রতা), হায়েজ (ঋতুস্রাব) ও নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া।

৪. নারীদের ইতেকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি শর্ত। স্বামী অনুমতি দেওয়ার পর ইতেকাফ থেকে বারণ বা বিরত রাখা যাবে না।

ইতেকাফ কোথায় করবেন

১. ইতেকাফ এমন মসজিদে করা, যেখানে নামাজের জামাত হয়।

২. ইতেকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদুল হারাম (বাইতুল্লাহ)।

৩. অতঃপর মসজিদে নববি (মদিনা)।

৪. তারপর বাইতুল মুকাদ্দাস (মসজিদে আকসা)।

৫. যে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেশি হয়।

৬. যে কোনো জামে মসজিদ।

৭. নারীরা নিজ ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে ইতেকাফ করবে। মসজিদে নারীদের জন্য ইতেকাফ করা বৈধ নয়।

ইতেকাফে বসার আদব—

১. ইতেকাফের সময়ে ভালো কথা ও কাজ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা। শ্রেষ্ঠ মসজিদকে ইতেকাফের জন্য নির্ধারিত করা।

২. ইতেকাফ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন, হাদিস অধ্যয়ন, দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা এবং শিক্ষা দেওয়া।

সর্বোপরি দুনিয়াবি কাজ-কর্ম থেকে বিরত থেকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও লাইলাতুল কদর পেতে ইবাদাত-বন্দেগিতে মশগুল থাকাই হলো ইতেকাফের আদব।