নোমান মাহফুজ: আজ পবিত্র শবে বরাত। এই রাত ভাগ্যরজনী নয়। ভাগ্য রজনী হলো, লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। প্রয়োজনে দেখুনঃ সূরা আল কদরের তাফসীর, যেকোনো তাফসীরগ্রন্থ থেকে। [শব্দটি মূলত শবে “বরাত” না, শবে “বারাআত”। বারাআত মানে মুক্তি। যেহেতু এই রাতে মুক্তির সুসংবাদ এসেছে তাই এই নাম]। শবে বরাতের রাতে আমরা ফেসবুকে দুয়া চাই। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে পোস্ট করি। আজগুবী অনেক কান্ড করি। আতশবাজিতেও ব্যস্থ থাকি। দোহাই সবার প্রতি, এসবে না থেকে আসুন মসজিদে গিয়ে বা নিজের ঘরে একাকী নফল নামাজ পড়ি, কুরআন তেলাওয়াত করি, তাসবীহ আদায় করি। আল্লাহর কাছে দুয়া করি।
সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলি! তিনিই সব। দিন থেকে সর্বস্থরের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় একটি পরিবেশ বিরাজ করছে। যার মাথায় সারা বছরেও একদিন টুপি দেখা যায়নি বা পাঞ্জাবী গায়ে দেখা যায়নি। আজ তিনি সেই লেবাসে একজন খাঁটি মুসলমান! আহ! এ পরিবেশ যদি সারা বছর আমাদের মধ্যে থাকতো, তবে ৯৫ শতাংশ মুসলমানের দেশে আমরা বুক ফুলিয়ে থাকতে পারতাম। আফসুস! আমরা যেমন একদিনের বাঙ্গালী হতে পারি, তেমনি একদিনেরও মুসলমান সাজতে পারি। অথচ এই রাতটি ফযিলতপূর্ণ; এর বিশেষত্ব আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবান (১৪ তারিখ দিবাগত রাত, অর্থাৎ শবে বরাত)—এর রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষনকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫, শায়খ আলবানি, আরনাউত্ব, আওয়ামাসহ মুহাদ্দিসগণ হাদিসটি সহিহ বা হাসান বলেছেন)। এটি একটি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা, এই ক্ষমার জন্য ইবাদত শর্ত নয় — বলেছেন শায়খ আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহ.। তবে কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে এই রাতে আমাদেরও উচিত নয়, ঘুমিয়ে থাকা — বলেছেন কোন কোন আলিম]।
আবার অনেকের মতে অন্যদিনের মতো আমরা যদি এশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়ি এবং ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করতে পারি তবে সারারাত জেগে থেকে ইবাদত করার সওয়াব অর্জনকারী হবো। সহীহ সনদে এই রাতের কোনো বিশেষ আমল নেই। তবে একাধিক য’ঈফ হাদীসে এসেছে, নফল সালাত, দু’আ ও কবর যিয়ারত করার কথা। মা’আরিফুল কুরআনের লেখক মুফতী শফী রহ. বলেন, আল্লাহর রাসূল যেহেতু জীবনে মাত্র একবার এই রাতে গোরস্তানে গিয়েছেন, তাই আমাদেরও একবারের অধিক গোরস্তানে যাওয়া উচিত নয়। (“কীভাবে কাটাবেন মাহে রমযান”— মুফতি তাকি উসমানি) যেহেতু সহিহ হাদিস অনুসারে এই রাতটি ফযিলতপূর্ণ সেহেতু এই রাতে আমরা (১) নফল সালাত পড়তে পারি, (২) সুন্নাহসম্মত বিভিন্ন যিকর করতে পারি, (৩) দু’আ করতে পারি, (৪) রাসূল (সা.) এর উপর দরুদ পড়তে পারি (৫) তাওবাহ—ইস্তেগফার করতে পারি (৬) দান—সাদাকাহ্ করতে পারি। এসব নফল ইবাদত এই রাতে বৈধ ও মুস্তাহাব হওয়ার পক্ষে মুসলিম উম্মাহর প্রায় সকল আলেম একমত। শাফি’ঈ, আহমাদ, আওযায়ী, ইসহাক, ইবনে তাইমিয়া, ইমাম নববি, ইবনুস সলাহ, ইবনুল হাজ্জ, ইবনে রজব হাম্বলি, শায়খ আলবানি (রাহিমাহুমুল্লাহ)—সহ অনেক আলেম এই রাতের ফযিলতের কথা বলেছেন ও নফল ইবাদত বৈধ ও মুস্তাহাব হওয়ার কথা বলেছেন। (মাসিক আল কাউসার, শায়খ মাহবুব আরিফির নোট দ্রষ্টব্য) ।
রাতটির বিশেষত্ব আছে বলেই এ রাতে যেকোনো নফল ইবাদত করা যায়। তবে এগুলো সুন্নাত মনে করা যাবে না বা যারা এসব ইবাদত করবে না তাদেরকে নিন্দা করা যাবে না। অত্যন্ত দুর্বল একটি হাদীসে এসেছে রোযার কথা। এজন্য এই রাতে রোযা রাখা রাখা সুন্নাত নয়। শবে বরাতের কোনো রোযা নেই। তবে যেহেতু নবীজি শাবান মাসে খুব বেশি পরিমাণে সিয়াম (রোযা) রাখতেন সেহেতু এই মাসে বেশি বেশি রোযা রাখা উত্তম। আর প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোযা রাখা তো সুন্নাত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রোযা রাখলে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু শবে বরাতের রোযা হিসেবে কোন রোযা রাখবেন না। তাই যারা রোযা রাখতে চান তাঁরা রাতে সাহরি খেয়ে রোযা রাখুন। কিন্তু এই নিয়ত রাখা যাবে না যে, এটা শবে বরাতের রোযা। এই রাতকে কেন্দ্র করে হালুয়া—রুটি করার একটি নিকৃষ্ট প্রথা, যা আমাদের সমাজে চালু হয়েছে। তেমনি হৈ—হুল্লোড়, আতশবাজি ফুটানো, মাসজিদে জমায়েত হওয়া — এগুলো খুবই বাজে প্রথা। যা কোনো হাদীসেই নেই। এই রাতে গোসলের কোনো ফযিলত আছে? মনে করা অত্যন্ত ভুল কাজ। এটি একটি বাজে প্রথা। এই রাতে গোসলের কথা হাদিসে আসেনি। কেউ সুন্নাত মনে করে এই রাতে গোসল করলে সেটি হবে বিদ’আত (দ্বীনে নবআবিষ্কার)। এই রাতের আমল হবে একাকী, সম্মিলিত নয়। এই রাতে বিশেষ সূরা বা বিশেষ বাক্য দিয়ে যেসব নামাযের কথা বলা হয় সেগুলো ভিত্তিহীন, বানোয়াট।
(মুফতি তাকী উসমানী, মাওলানা আবদুল মালেক, শায়খ আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ.), শায়খ আবদুল কাইয়ুম, মুহাদ্দিস মাহবুবুল হাসান আরিফি— প্রমূখ আলেমদের লিখনী ও লেকচার থেকে সংক্ষেপিত)।
আপনার মতামত লিখুন :