

বাংলাদেশি সমাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল—আমরা প্রায় সবাই ‘হুজুগে’। মুহূর্তের আবেগে এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগই তৈরি হয় না। সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলো—জাফলং, ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি, লোভাছড়ায়। এখানকার পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়া ও তৎপরবর্তী ঘটনা তার এক জীবন্ত উদাহরণ।
একসময় এই অঞ্চলগুলো ছিল দেশের অন্যতম ব্যস্ত অর্থনৈতিক কেন্দ্র। শত শত পাথর কোয়ারি থেকে প্রতিদিন টনকে টন পাথর উত্তোলন হত। হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ছিল এ শিল্পে। ক্রাশড পাথরে ভরা অসংখ্য ট্রাক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্মাণশিল্পের চাহিদা মেটাত, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিবেশী ভারতে রপ্তানিও হত। এ ব্যবসা শুধু আঞ্চলিক অর্থনীতিকেই নয়, জাতীয় রাজস্ব আয়েও বড় অবদান রাখত।
কিন্তু হঠাৎ করেই, পরিবেশ রক্ষার নামে পাথর উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ জারি হল। তাতে মুহূর্তেই থমকে গেল এ অঞ্চলের কর্মচাঞ্চল্য। বাজারে নির্মাণশিল্পে কাঁচামালের ঘাটতি তৈরি হল, শ্রমিকেরা কাজ হারাল ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ল। ঠিক একই সময়ে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় শত শত নতুন পাথর কোয়ারি চালু হল। তারা নিজেদের নদী থেকে পাথর জমা করে রাখে এবং পরে সেই পাথরই উচ্চমূল্যে বাংলাদেশে বিক্রি করে। অভিযোগ রয়েছে—তৎকালীন সরকার কোয়ারিগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মূলত ভারতের স্বার্থ রক্ষা ও তাদের অনুকম্পা লাভের জন্য। ভারতের জন্য এটি দ্বিগুণ সুবিধা : একদিকে নিজেদের নদীতে পাথর ধরে রাখা, অন্যদিকে বাংলাদেশে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন।
ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হাজারো স্থানীয় শ্রমিক বেকার হয়েছে ও আমরা নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করছি।
অনেকে মনে করেন পাথর উত্তোলন বন্ধ মানেই পরিবেশ রক্ষা। বাস্তবে এ ধারণা সবসময় সঠিক নয়। কারণ নদী ও পাহাড়ি জলধারার একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য আছে, যা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়।
সহজভাবে বললে—পাথর নিজে বন্যা সৃষ্টি করে না, কিন্তু পাথর উত্তোলন বন্ধ হলে নদীর নাব্যতা, অর্থাৎ গভীরতা ও প্রবাহের ক্ষমতা, নষ্ট হয়ে যায়। ঘটনাপ্রবাহটি হয় এভাবে—
১। বর্ষাকালে মেঘালয়ের প্রচুর বৃষ্টির পানি পিয়াইন, ধলাই, সারি ও ডাউকি নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
২। আগে নিয়মিত পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর তল গভীর ও প্রশস্ত থাকত, ফলে পানি দ্রুত সরে যেত।
৩। উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর প্রতি মৌসুমে পাহাড়ি স্রোতে আসা নতুন পাথর নদীর মুখ ও তলদেশে জমতে থাকে।
৪। জমাট পাথর ধীরে ধীরে নদীকে অগভীর ও সরু করে ফেলে।
৫। অতিরিক্ত বর্ষার পানি দ্রুত সরে যেতে না পেরে নদীতে আটকে যায়।
৬। জমে থাকা পানি চারপাশের নিম্নাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট এলাকায় আকস্মিক ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা সৃষ্টি করে।
এক্ষেত্রে ভারতের বাঁধ দেওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না—শুধু নদীর মুখ অগভীর হয়ে গেলেই বর্ষায় পানি জমে বন্যা হয়।
পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অবাধ উত্তোলনও ক্ষতি ডেকে আনে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সুযোগ পেয়েই এখন কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন পাথর উত্তোলন শুরু হয়েছে, যা নদীর গতিপথ পরিবর্তন করছে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট করছে ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে। ফলে আমরা একদিকে করেছি সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার ভুল, অন্যদিকে এখন করছি অবাধ লুটপাট—দুটি চরম সিদ্ধান্তের মাঝখানে কোথাও নেই টেকসই সমাধান।
পাথর উত্তোলন বন্ধ বা অবাধ উত্তোলন—দুটো পথই ক্ষতিকর। প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব নীতি, যা একদিকে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে পরিবেশের সুরক্ষা দেবে।
যা করা জরুরি—
বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব উত্তোলন নীতি প্রণয়ন
আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরিবেশগত ক্ষতি কমানো
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে কোয়ারি পরিচালনা
স্থানীয় কর্মসংস্থান পুনঃস্থাপন
নদী ও জলাশয়ের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা
পাথর উত্তোলনকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করলে আমরা শুধু অর্থনীতিকে শক্তিশালী করব না, বরং নির্মাণশিল্পে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানির সম্ভাবনাও উজ্জ্বল করব। আমাদের সামনে তাই একটি স্পষ্ট প্রশ্ন—আমরা কি আবারও হুজুগে আবেগে নিজেদের ক্ষতি করব, নাকি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে পাথরকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করব?
লেখক : প্রফেসর, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
# প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের নিজস্ব।
আপনার মতামত লিখুন :