গোলাপগঞ্জের গ্যাস- গোলাপগঞ্জে নেই


admin প্রকাশের সময় : আগস্ট ৮, ২০২৫, ০৬:০৯ /
গোলাপগঞ্জের গ্যাস- গোলাপগঞ্জে নেই

আনোয়ার শাহজাহান: সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলা—বাংলাদেশের গ্যাস ও তেল উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র এখানেই অবস্থিত, যা দেশের জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক কোটি কোটি টাকার গ্যাস সরবরাহ করে। অথচ, এই প্রাকৃতিক সম্পদের আয়োজক, গোলাপগঞ্জবাসী আজও নিজ নিজ বাড়িতে গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, গ্যাসক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট চাকরিতে স্থানীয় যুবকদের সুযোগ না পাওয়া, পানির স্তর হ্রাস, নদীভাঙন ও বন্যা—সব মিলিয়ে এখানে মানুষের জীবনে নানা দুঃখ-দুর্দশার সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
গোলাপগঞ্জের ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। তিনশত ষাট আউলিয়ার স্মৃতিধন্য এই জনপদ জ্ঞানী-গুণীর জন্মস্থান হিসেবে সুপরিচিত। বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রী চৈতন্য দেবের পদধূলি স্পর্শ করা এই মাটি আজও তার ঐতিহ্য সংরক্ষণে গর্বিত। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ও এই অঞ্চল সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। প্রবাসী অধ্যুষিত এই উপজেলায় বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স অর্থনৈতিক জীবনে প্রাণ সঞ্চার করে।

কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র: দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চার
কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস ক্ষেত্র। এখানে থেকে উত্তোলিত গ্যাস প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২১ মিলিয়ন ঘনফুট প্রবাহিত হয়। এর বাজারমূল্য বছরে প্রায় ১৬২০ কোটি টাকা। এই গ্যাস দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, গৃহস্থালি চাহিদা ও যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়।
কিন্তু এদিকে, গোলাপগঞ্জের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত। তারা এখনো রান্নার জন্য কাঠ, কোয়েল বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে বাড়তি ব্যয় ও ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি নারীদের রান্নার কাজের সময় ও শ্রমও বেড়ে যাচ্ছে।

গ্যাস সংযোগ বঞ্চনা: বৈষম্যের বাস্তব ছবি
গোলাপগঞ্জের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করে আসছেন। অনেকে নির্ধারিত ফি জমা দিয়েছেন, আবার অনেকে অপেক্ষায় রয়েছেন। তবু, এখনো অধিকাংশ বাড়িতে গ্যাস পৌঁছায়নি। এর পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং অগ্রাধিকারবিহীন বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে।
তালিকাভুক্ত পরিবারগুলোর ভেতর বহু গরীব ও মেধাবী রয়েছে, যারা শুধুমাত্র গ্যাস পেলে জীবনের অনেক কষ্ট কমে যেত। এই অবস্থায় স্থানীয়দের দাবী, যেখান থেকে গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে, সেখানকার মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

চাকরিতে স্থানীয়দের সুযোগের অভাব
গ্যাসক্ষেত্র ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়রা চাকরি পাচ্ছেন না। চাকরির সুযোগ প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজন এবং দূরের ব্যক্তিদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় যুবকদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার সংকট
গ্যাস ও তেল উত্তোলনের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। যেখানে আগে ৫০-৬০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত, বর্তমানে কিছু এলাকায় ২৫০-৩০০ ফুট গভীরে না গেলে পানির সন্ধান মেলেনা। এতে গ্রামের মানুষের জন্য নলকূপ স্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়েছে।
গোলাপগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড এই সংকটের প্রবল উদাহরণ। বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

CSR ফান্ডের অনুপযুক্ত ব্যবহার
গোলাপগঞ্জে অবস্থিত এই গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত বড় কোম্পানিগুলো করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (CSR) নামে একটি ফান্ড পরিচালনা করে থাকে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই ফান্ডের অর্থ গোলাপগঞ্জে যথাযথভাবে ব্যয় হয়নি। হলেও গোলাপগঞ্জের জনগণ জানে না কোথায় হয়েছে বা হচ্ছে। এটি জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, এই ফান্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তা দ্রুত এলাকার কল্যাণে ব্যয় করা হোক।

সমাধানের জন্য প্রস্তাবিত করণীয়
১. গৃহে গৃহে গ্যাস সংযোগ: নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে দ্রুত প্রতিটি পরিবারে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
২. চাকরিতে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার: গ্যাসক্ষেত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে স্থানীয় যোগ্য যুবকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৩. পানির সংকট নিরসন: ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও গভীর নলকূপ স্থাপনসহ স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. বন্যা ও নদী ভাঙন রোধ: সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর খনন, তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।
৫. CSR ফান্ডের সুষ্ঠু ব্যবহার: এই ফান্ডের অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থানীয় উন্নয়ন কাজে ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।
৬. স্থানীয় চাহিদা পূরণ: জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের আগে স্থানীয় গ্যাস চাহিদা পূরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বর্তমান সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও নাগরিক কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। সারা দেশে কিছু না কিছু উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু গোলাপগঞ্জের মতো গ্যাস উৎপাদনকারী উপজেলায় যদি স্থানীয় জনগণ গ্যাস সংযোগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তা দেশের সুশাসনের মূলমন্ত্রের পরিপন্থী।

সরকারের নিকট বিনীত অনুরোধ, যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে গোলাপগঞ্জের প্রতিটি ঘরে গ্যাস পৌঁছানো হয় এবং স্থানীয় যোগ্য যুবকদের চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়। এতে জনমানুষের আস্থা ও উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আমরা গোলাপগঞ্জবাসী বিশ্বাস করে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে সদয় হস্তক্ষেপ করবেন এবং এই এলাকার উন্নয়ন সাধনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
৮ আগস্ট ২০২৫