‘যদি মারা যাই, বলবে আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে’


admin প্রকাশের সময় : জুলাই ১৪, ২০২৫, ২২:১৮ /
‘যদি মারা যাই, বলবে আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে’

জুলাইয়ে রাজধানীর উত্তরায় ৯ নম্বর সেক্টরে বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী নাঈমা সুলতানা গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়। ‘জুলাই উইমেন’ শীর্ষক চলচ্চিত্রে আন্দোলন চলাকালে শহীদ হওয়া সেই নাঈমার স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে। নাঈমার কথা বলতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছেন তাঁর মা আইনুন বেগম। আরো যত মায়ের বুক খালি হয়েছে, সেসব হত্যাকাণ্ডেরও বিচার দাবি করেন তিনি।

ডেআইনুন বেগম বলেন, “১৯ জুলাইয়ের ঠিক আগের রাতে নাইমা আমাকে বলেছিল, ‘আম্মু, ধরো না আমি আন্দোলনে গিয়ে যদি মারা যাই, তাহলে তুমি কী বলবে?’ আমার উত্তর দেওয়ার আগেই সে নিজেই বলে উঠল, ‘বলবে আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে, আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে’।”

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রদর্শিত প্রায় ২২ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা, আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ও আন্দোলন-পরবর্তী নারীদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ‘জুলাই উইমেনস ডে’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে ‘জুলাই উইমেনস ডে’ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হয়।

আয়োজনে ছিল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সহযোগিতায় ছিল মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
‘জুলাই উইমেন’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পর সংগীতশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান জুলাইয়ের গান ‘আমরা জুলাই ভুলতে দিব না বন্ধু’ পরিবেশন করেন।

এ সময় তিনি মব সন্ত্রাস ও নারীদের ওপর হয়রানি, ধর্ষণ ও সহিংসতার বিচার দাবি করে বলেন, ‘নারীরা যেন সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় সব জায়গায় থাকতে পারে। যে বিচারগুলো হয়নি, সেগুলো করুন। যৌন হয়রানি করে যারা এবং ধর্ষক যারা, তাদের জন্য এই মাটিতে জাহান্নাম ঘোষণা করুন। আমি জুলাইয়ের কন্যা, আমি নিজেও আজ শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে। সরকারের সঙ্গে বারবার দেখা হয় না, এই সুযোগে বলে দিলাম আপনারা আমাদের হয়ে কাজ করবেন।

জনবান্ধব নারীবান্ধব সমাজ বিনির্মাণ করুন।’
এ সময় তিনি নারীদের নিয়ে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নিয়ে ও আবরার ফাহাদকে নিয়ে তিনটি গান পরিবেশন করেন।

স্মৃতিচারণামূলক বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেন, ‘জুলাই মেয়েরা যারা আছ, যারা নেতৃত্বে ছিলে, তোমাদের যেভাবে অসম্ভব যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে, তোমাদের বুঝতে হবে, জুলাইয়ের সামনে-পেছনে আশপাশে যারা ছিল, তাদের ওরা আঘাত করার চেষ্টা করছে। একটা কথা ছিল না—আসছে ফাগুন আমরা হব দ্বিগুণ। আমরা এখন শত গুণ, হাজার গুণ। দল থাকবে, মত থাকবে, ভিন্ন মত থাকবে, নারীর অবমাননায়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে, এভাবে আরো একবার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাব।’

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ডিবি হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়কের একজন নুসরাত তাবাসসুম বলেন, ‘জুলাইয়ে নারীরা নাগরিক হিসেবে নেমেছিল, নারী হিসেবে নয়। তারা একজন নাগরিকের সমস্ত দায়িত্ব কটূক্তি ছাড়া পালন করতে চায় এবং নাগরিক অধিকারগুলো নিজেদের জীবনে কটূক্তি ছাড়া উপভোগ করতে চায়। তারা নিজেদের নারী হিসেবে নয়, নাগরিক হিসেবে বেশি সম্মানিত মনে করে এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে আর দিন কাটাতে চায় না। জুলাইয়ে নারীরা প্রমাণ করেছে যে তারা একই সময়ে মার খেতে পারে, মিছিল করতে পারে, পদযাত্রা করতে পারে, গণযাত্রা করতে পারে, স্বৈরাচার ও খুনিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, জেলে যেতে পারে এবং শহীদ হতে পারে।’

স্মৃতিচারণামূলক বক্তব্যে শহীদ নাইমার মা আইনুন বেগম বলেন, ‘নাইমা এই আন্দোলনের সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িত ছিল। ফেসবুক আর অনলাইনে সে সব সময় সব কিছু শেয়ার করত, লাইভে থাকত।’

এরপর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি ছোট্ট প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত নারীদের নিয়ে। এরপর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দৃষ্টিশক্তি হারানো জুলাই যোদ্ধা মাহবুবের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। এরপর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথ কাঁপানো বিভিন্ন স্লোগান দেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্মরণ করেও অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ‘দীপক কুমার গোস্বামী’, ‘জুলাই বিষাদ সিন্ধু’, ‘জুলাই বীরগাথা’—এসব চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও শহীদ পরিবারের স্মৃতিচারণার পর জুলাই উইমেন ডে কনসার্টে সংগীত পরিবেশন করেন ইলা লালা, এফ মাইনর, পারসা মাহজাবিন ও এলিটা করিম। অনুষ্ঠানে অন্যতম আকর্ষণ ছিল ড্রোন শো।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে ‘জুলাইয়ের ভূমিকা’ ড্রোন শো করা হয়। এতে দেখানো হয় বিডিআর গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, ইলিয়াস আলী, ব্যারিস্টার আরমান, মাইকেল চাকমা গুম, আবরার ফাহাদ স্মরণে পরাধীনতার দিনগুলো, ‘স্টেট স্পন্সর লুটিং’ শিরোনামে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, এস আলম, সালমান এফ রহমান, ‘রাতের ভোট’ শিরোনামে শেখ হাসিনার ব্যালট বাক্স চুরিসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন স্লোগান ও নারীদের ভূমিকাসংশ্লিষ্ট কয়েকটি চিত্র।