নির্বাহী বিভাগের কবজায় ছিল বিচার বিভাগ ও আইনসভা


admin প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৩১, ২০২৪, ০৫:০৯ /
নির্বাহী বিভাগের কবজায় ছিল বিচার বিভাগ ও আইনসভা

বছরজুড়ে আলোচিত ছিল নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার দৌরাত্ম্য। কয়েক বছর ধরেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দুই অঙ্গ বিচার বিভাগ ও আইনসভার ওপরে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। রাতের ভোটখ্যাত একাদশ সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন।

এ নির্বাচনেও আমলাদের একছত্র প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। তাদের খুশি করতে না পারায় নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী। আবার বছরের শেষ ভাগে তাদের পদপদবি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ছিল সবচেয়ে আলোচনার বিষয়। এ বছরই ঘটে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সদস্যদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। আবার কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়ে জেলবন্দি। নতুন সরকারেও আমলাদের প্রভাব কমেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে টানা চতুর্থ দফায় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এই নির্বাচন আয়োজনের পুরোভাগে ছিল প্রশাসন ও পুলিশ। বিরোধী দল বিএনপির বর্জন ও হরতালের ডাকের মধ্যেই শেষ হয় ওই নির্বাচন। এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের অনেক প্রার্থী অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। বলা হয়, এর আগের তিনটি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের প্রতি জনপ্রশাসন ও পুলিশের প্রত্যক্ষ সমর্থন সহায়তা ছিল, ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তাই ঘটেছে।

অবশ্য বছর শেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের গঠন করা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গত ৯ ডিসেম্বর দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রশ্নবিদ্ধ তিনটি নির্বাচনে কারচুপির তথ্য জানতে ৩০ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠান। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসন ক্যাডারের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা থাকেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)।

নির্বাচনে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা বাগিয়ে নিতে আমলাদের তৎপরতাও ছিল দৃশ্যমান। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী এমপিরাও কয়েক মাস পার না হতেই সংসদের বৈঠকেই আমলাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। নির্বাহী বিভাগের দাপটে সংসদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে শুধুই আনুষ্ঠানিকতায়। সংসদীয় কমিটির বৈঠকগুলোতে সচিবদের অনুপস্থিতি ছিল আলোচিত ঘটনা। পাশাপাশি সংসদীয় কমিটিতে কী কী বিষয় আলোচিত হবে তাও অনেকাংশেই নির্ভর করত মন্ত্রণালয়ের ইচ্ছার ওপর। পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমে আমলাদের হস্তক্ষেপ ছিল অনেকটাই প্রকাশ্য বিষয়।

আইনসভার মতোই বিচার বিভাগও পরিচালিত হয়েছে নির্বাহী বিভাগের ইশারায়। সরকার অপছন্দ করে অথবা বিব্রত হয় এমন যে কোনো ইস্যুতে আদালতের রায় ছিল লক্ষণীয়। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা তুলে দেওয়ার বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি ‘বিতর্কিত’ রায়কে কেন্দ্র করে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এক পর্যায়ে রূপ নেয় সরকারবিরোধী একদফার আন্দোলনে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে ছাত্র আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।

সরকার পাল্টে গেলেও আদালতের অস্থিরতা থামেনি। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপিদের দেশ ত্যাগের কয়েকদিনের মাথায় ছাত্র-জনতার দাবির মুখে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি পদত্যাগ করেন। এরপর ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ প্রথম কোনো বিচারপতি হাইকোর্ট বিভাগ থেকে সরাসরি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পতিত সরকারের দোসর হিসেবে কাজের অভিযোগে ১২ বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়।

একই সময়ে বেশকিছু পরিবর্তন ঘটে বিচারাঙ্গনে। বছরের শেষভাগে আদালত থেকে রায় আসে, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহালের। এ ছাড়াও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রায়ে তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত ও খালাস, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অবৈধ, চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় বাবরসহ সাত আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।