-আরশাদ ইলয়াস
সম্প্রতি ঢাকার একটি বাসায় মৃত মায়ের লাশ পঁচে-গলে পড়ে থাকার নির্মম ঘটনাটি আমাদের সমাজকে আরও একবার স্তব্ধ করে দিয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সন্তানকে নিছক ‘দুনিয়াদার’ ও ভোগবাদী হিসেবে গড়ে তোলার এক ভয়ঙ্কর জাগতিক পরিণতি। সন্তানকে দ্বীনের আলো না দিয়ে শুধু দুনিয়ামুখী করার কুফল অনেক মা-বাবাকে দুনিয়াতেই ভোগ করতে হচ্ছে, আর আখিরাতের কঠিন শাস্তি তো নির্ধারিত আছেই।
সন্তানকে বড় করার পেছনে আমরা সময় ও সুশিক্ষা ইনভেস্ট না করে কেবল টাকা বিনিয়োগ করাকেই যথেষ্ট মনে করছি। আমাদের ধারণা—ধর্মীয় শিক্ষা দিলে সন্তান হয়তো অভাব-অনটনে পড়বে, আর তথাকথিত সেক্যুলার শিক্ষা দিলে সব অভাব দূর হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবতা হলো, এই বস্তুবাদী শিক্ষা হয়তো সন্তানের আর্থিক অভাব দূর করছে, কিন্তু তার ভেতরের মানবিকতা ও নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আধুনিক ও প্রগতিশীল হওয়ার অন্ধ দৌড়ে সন্তানরা মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধও হারিয়ে ফেলছে।
ইসলাম সন্তানকে কেবল দুনিয়াদার বানানোর এই আত্মঘাতী প্রবণতাকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন: ❝হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো আগুন (জাহান্নাম) থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।❞ [আল-কুরআন, সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ৬]
সন্তানকে শুধু ক্যারিয়ার গড়া শেখানো আর দ্বীন না শেখানো প্রকারান্তরে তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়া।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি মাধ্যম ছাড়া: সাদাকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৬৩১]
যে সন্তানকে আমরা কেবল দুনিয়াদার বানালাম, সে মৃত্যুর পর দুআ করা তো দূরের কথা, জানাযার নামায পড়ার যোগ্যতাও অর্জন করে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা চাইলে সব গুনাহের শাস্তি কিয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু মা-বাবার অবাধ্যতার শাস্তি তিনি মৃত্যুর আগেই দুনিয়াতে দিয়ে দেন।” (বায়হাকি)
আধুনিক বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের আলো Evaluation
আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানও এখন স্বীকার করছে যে, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধহীন শিক্ষা মানুষকে চরম স্বার্থপর করে তোলে।
সাইকোলজিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু চরম বস্তুবাদী (Materialistic) পরিবেশে বড় হয়, তাদের মধ্যে সহমর্মিতা (Empathy) এবং কৃতজ্ঞতাবোধ অত্যন্ত কম থাকে। তারা মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং 'ইউটিলিটি' বা উপযোগিতার নজরে দেখে। মা-বাবা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান এবং সন্তানের কোনো উপকারে আসেন না, তখন বস্তুবাদী সন্তান তাদের ‘অপ্রয়োজনীয় বস্তু’ মনে করে অবহেলা করে।
আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বলছে, উচ্চ আইকিউ (IQ) বা ভালো রেজাল্ট একজন মানুষকে বড় চাকরি এনে দিতে পারে, কিন্তু নৈতিক বুদ্ধিমত্তা (MQ) ছাড়া সে কখনো ভালো সন্তান বা ভালো মানুষ হতে পারে না। ধর্মীয় অনুশাসন ও পরকালের ভয় মানুষের মস্তিষ্কে ‘সেলফ-কন্ট্রোল’ এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গাটি জাগ্রত রাখে, যা সেক্যুলার শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আমরা আধুনিকতা ও বাস্তববাদী হওয়ার নেপথ্যে নিজেদের এবং সন্তানদের এক দীর্ঘস্থায়ী বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। দিনশেষে সন্তানদের পেছনে আমাদের সমস্ত শ্রম ও অর্থ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। তাই সন্তানকে দুনিয়াদার বানানোর আগে অন্তত তাকে আল্লাহর ভয়, পরকালের জবাবদিহিতা এবং মানুষের প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া আবশ্যক।
সম্পাদক প্রকাশক : খন্দকার মোঃ বদরুল আলম । কার্যালয়, মার্ভেলাস টাওয়ার দিত্বীয় তলা ১০/১১ নং অফিস সিলেট-গোলাপগঞ্জ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ০১৭২০৫৫৪৫৯০। ই-মেইল : gbbartanews@gmail.com