২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট। জুমার নামাজের পর সিলেট নগরীর কালেক্টরেট মসজিদের সামনে থেকে মিছিল বের করে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় সড়ক বিভাজকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন দৈনিক নয়াদিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের রিপোর্টার আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব (এটিএম তুরাব)। মিছিলটি কোর্ট পয়েন্ট থেকে কয়েকশ’ গজ দূরে যাওয়ার পরই পেছন থেকে গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু করে পুলিশ। বিভাজক থেকে নেমে সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করেন তুরাব।
এসময় এক কনস্টেবলের হাত থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে তুরাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েন সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) সহকারী পুলিশ কমিশনার সাদেক কাউসার দস্তগীর। প্রেস লেখা ভেস্ট পরা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন তুরাব। প্রথমে তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে বেসরকারি একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তুরাব মারা যান।
তুরাবকে গুলি করার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে দাবি ওঠে তাকে টার্গেট কিলিং করা হয়েছে। প্রেস লেখা ভেস্ট শরীরে থাকাবস্থায় সাংবাদিক পরিচয় জেনেই এডিসি দস্তগীর এক কনস্টেবলের রাইফেল কেড়ে নিয়ে গুলি করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, তুরাবকে কেন টার্গেট করেছিলেন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর।
জানা গেছে, এটিএম তুরাব তার পত্রিকায় ক্রাইম নিউজই বেশি করতেন। পুলিশের অপরাধ নিয়েও লেখালেখি করতেন তিনি। এতে ক্ষিপ্ত ছিলেন সিলেট কোতোয়ালী থানার সাবেক সহকারী কমিশনার (পরবর্তীতে অতিরিক্ত উপকমিশনা পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) সাদেক কাউসার দস্তগীর।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সিলেট নগরীর নাইওরপুলে একটি দুর্ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে যান তুরাব। এসময় এডিসি দস্তগীর ও কোতোয়ালী থানার তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ আলী মাহমুদের আক্রমনের শিকার হন তিনি। এডিসি দস্তগীরের নির্দেশে ওসি আলী মাহমুদ ও একজন উপপরিদর্শক (এসআই) সাংবাদিক তুরাবকে লাঠিচার্জ করেন। এর প্রতিবাদ করতে গেলে দৈনিক কালবেলার ব্যুরো প্রধান মিঠু দাস জয়ও লাঞ্ছিত হন।
তুরবারে সহকর্মীদের অভিযোগ, এটিএম তুরাবের পেশাগত দায়িত্ব পালন নিয়েই তার উপর ক্ষোভ ছিল এডিসি দস্তগীরের। সেই ক্ষোভের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল নাইওরপুলে। আর শেষটা ঘটেছে জুলাই আন্দোলনে কোর্ট পয়েন্টে। তুরাবকে হত্যার উদ্দেশ্যেই টার্গেট করে গুলি ছুঁড়েছিলেন দস্তগীর।
তুরাব গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তার সাথে ছিলেন দৈনিক কালেরকন্ঠের আলোকচিত্রি আসকার আমিন রাব্বি ও দৈনিক মানবজমিনের আলোকচিত্রি মাহমুদ হোসেন। আসকার আমিন রাব্বি জানান, এডিসি দস্তগীর যেখানে দাঁড়ানো ছিলেন সেখান থেকে সাংবাদিকদের অবস্থান পরিস্কার ছিল। তুরাবের পরণে প্রেস লেখা ভেস্টও দৃশ্যমান ছিল। একজন কনস্টেবলের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তিনি যেভাবে গুলি করেছেন তাতে এটাই প্রমাণ হয় যে, তুরাব টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছে।
তুরাবকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করেন তার কর্মস্থল দৈনিক জালালাবাদের সম্পাদক মুকতাবিস উন নূরও। তিনি বলেন, তুরাব পত্রিকায় অপরাধ বিষয়ক সংবাদ করতো। তুরাবের মৃত্যুর পর অফিস থেকে তিনি জানতে পেরেছেন এডিসি দস্তগীরের সাথে একদিন তুরাবের কথা কাটাকাটিও হয়েছে। এই রেশ থেকেই দস্তগীর তুরাবকে হত্যা করেছেন। তুরাবকে হত্যা করতে এডিসি দস্তগীর হয়তো জুলাই আন্দোলনের নৃশংসতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।
এদিকে, তুরাব হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও কনস্টেবল উজ্জ্বল সিংহকে আগামী রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১৩ মে যুক্তরাজ্য প্রবাসী তানিয়া ইসলামকে বিয়ে করেন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। একমাস পর স্ত্রী চলে যান যুক্তরাজ্যে। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকায় সেসময় মৃত স্বামীর মুখও দেখতে পারেননি তানিয়া। হত্যাকান্ডের ঘটনায় তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আজরফ জাবুর বাদি হয়ে প্রথমে কোতোয়ালী থানায় ও পরে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
সম্পাদক প্রকাশক : খন্দকার মোঃ বদরুল আলম । কার্যালয়, মার্ভেলাস টাওয়ার দিত্বীয় তলা ১০/১১ নং অফিস সিলেট-গোলাপগঞ্জ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ০১৭২০৫৫৪৫৯০। ই-মেইল : gbbartanews@gmail.com