মুফতী শাহ মুতিউর রহমান চৌধুরী
মুনাফিকরা সমাজের বাইরের কেউ নয়। এরা সমাজের মধ্যেই বসবাস করে। যেকোনো ধর্মের পরিচয়েই সমাজে চলে এবং দৃষ্টিগত ধর্মের আনুষ্ঠানিকতায়ও অংশ নিয়ে থাকে। তাই আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা এদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে বলে দিয়েছেন। যাতে করে সচেতন ব্যক্তিরা সহজেই এদের চিহ্নিত করতে পারে এবং এদের থেকে সতর্ক থাকতে পারে।
কোরআনে শতাধিক আয়াতে মুনাফিকদের বিষয়ে আলোচনা এসেছে। তা ছাড়া কোরআনে মুনাফিকদের নামে একটি সুরাও রয়েছে। বলা হয়েছে- ‘চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হবে প্রকৃত মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পূর্ণভাবে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। সেগুলো হলো :
১. সম্পদ গচ্ছিত রাখা হলে তা হনন করে;
২. মিথ্যা কথা বলে;
৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে;
৪. বিবাদে লিপ্ত হলে বিস্ফোরিত হয় (ফাজারা) অশ্লীল গালি দেয়, সত্য থেকে বিচ্যুত হয়, অত্যন্ত অবিবেচক, অযৌক্তিক, মূর্খ, মন্দ এবং অপমানজনক আচরণ করে।’ আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুনাফিকের চিহ্ন হলো তিনটি। ১. কথা বললে মিথ্যা বলে, ২. ওয়াদা করলে তা খেলাপ করে, ৪. আমানতের খেয়ানত করে।’ অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘যদিও সে রোজা রাখে এবং নামাজ পড়ে ও ধারণা করে যে সে মুসলিম।’ (সহিহুল বোখারি ৩৩, ২৬৮২, ২৭৪৯, ৩১৭৮, মুসলিম ৫৮, তিরমিজি ২৬৩২, নাসায়ি ৫০২০, আবু দাউদ ৪৬৮৮, আহমাদ ৬৭২৯, ৬৮২৫, ৬৮৪০)।
সর্বজনীনতায় মুনাফিকের আলামগুলো : ব্যাধিগ্রস্ত মন, খেয়াল-খুশির প্রলোভন, অহংকার প্রদর্শন, দোটানা-দোদুল্যমান মনোভাব, মিথ্যা শপথ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কাপুরুষতাণ্ডঅস্থিরতা, যা করেনি তা করার নামে প্রশংসাপিয়াসী, সৎকর্মকে দূষণীয় গণ্য করা, নিম্নতম অবস্থানে খুশি, অন্যায়ের আদেশ ও ন্যায়ের নিষেধ, মানুষের দৃষ্টির আড়াল হওয়ার চেষ্টা, আমানতের খেয়ানত করা, কথোপকথনকালে মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করা এবং বাগবিত-াকালে বাজে কথা বলা ও কুরুচিপূর্ণ বচন-বাচালতা।
মুনাফিকরা সমাজের সরলমনা মানুষ ও ধার্মিক ব্যক্তিদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য দরবেশের মতো পোশাক পরিধান করে থাকে। তাদের বেশভুষা দেখলে মনে হবে এ ব্যক্তি নিশ্চয় ভালো মানুষ এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা। ধর্মীয় পোশাক বলতে যা বোঝায় তা তারা যথাযথভাবেই পরিধান করে। ধর্মীয় পোশাক দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে, তারাই প্রকৃত মুনাফিক। তারা কথার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত মিষ্টিমধুর কথা বলে। কথা শুনলে মনে হবে এই মানুষের দ্বারা কোনো পাপকাজে লিপ্ত হওয়া অসম্ভব। আল্লাহতায়ালা কোরআনে এদের কথা উল্লেখ করে বলেন- ‘তুমি যখন তাদের দিকে তাকাবে তখন তাদের (বাইরের) দেহাবয়ব তোমাকে খুশি করে দেবে আবার যখন তারা তোমার সঙ্গে কথা বলবে তখন তুমি (আগ্রহভরে) তাদের কথা শুনবেও।’ (সুরা মুনাফেকুন, আয়াত : ৪)
মুনাফিকদের চিহ্নিতকরণে তাদের বাইরের এই রূপ দেখে যেন মানুষ প্রতারিত না হয় সেজন্য আল্লাহতায়ালা তাদের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। মুনাফিকের পরিচয় বর্ণনা করতে গিয়ে রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘অবশ্যই মুনাফিকরা আল্লাহতায়ালাকে ধোঁকা দে।, (মূলত এর মাধ্যমে তিনিই আল্লাহ) তাদের প্রতারণায় ফেলে দিচ্ছেন, এরা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন একান্ত আলস্য ভরেই দাঁড়ায়, তারা কেবল লোকদের দেখায়। এরা আল্লাহতায়ালাকে কমই স্মরণ করে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৪২)
মুনাফিকের দল নিজেরা সব সময় পাপকাজ, অন্যায় কাজের মাঝে ডুবে থাকে। অন্যের সম্পদ জোর করে ভোগদখল করে। তারা দুর্বল মানুষের ওপর প্রতিপত্তির জোরে অবিচার করে। তাদের কাছে কেউ যখন কোনো পরামর্শের জন্য আসে তখন তারা তাদের সুপরামর্শের বদলে কুপরামর্শ দেয়। তাদের কাছে যখন কোনো অভাবী, গরিব, মিসকিন সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায় তখন তারা দানখয়রাত করে না। তারা এতিমের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না। কোরআনে মুনাফিকদের আরো কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এরা একে অন্যের মতোই অসৎকাজের আদেশ দেয় ও সৎকাজ থেকে বিরত রাখে এবং (আল্লাহতায়ালার পথে খরচ করা থেকে) উভয়েই নিজেদের হাত বন্ধ করে রাখে।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬৭)
মুনাফিকদের শাস্তির ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা মুনাফিক পুরুষ ও নারী এবং কাফেরদের জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬৮) জাহান্নাম এমন একটি ভয়াবহ জায়গা যা বর্ণনা করে কোনো মানুষকে বোঝানো সম্ভব নয়। জাহান্নামিদের খাবার দেওয়া হবে গলিত রক্ত, পুঁজ এবং কাঁটাযুক্ত ফল এবং তাদের পান করতে দেওয়া হবে ফুটন্ত গরম পানি; যা তাদের নাড়িভুঁড়িকে ছিঁড়ে দেবে। আল্লাহতায়ালা মুনাফিকদের এমন ভয়াবহ আজাবের স্থান জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন এবং তারা সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে। সেখানে তাদের অবস্থা এমন হবে যে, তারা মৃত্যু কামনা করবে কিন্তু তাদের মৃত্যু হবে না। আল্লাহতায়ালা মানুষের অপরাধ অনুপাতে তাদের জাহান্নামের বিভিন্ন স্তরে রাখবেন। এ ক্ষেত্রে মুনাফিকদের স্থান হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে, তুমি সেদিন তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী খুঁজে পাবে না।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৫)
অতএব আমরা যাতে করে মুনাফিকি স্বভাব থেকে মুক্ত থেকে মানুষের কল্যাণ ও নির্মল সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগ করতে পারি আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালার দরবারে রাউফুর রাহিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার সদকায় সাহায্য প্রার্থনা করি।
মুহতামিম
জামিয়া হিদায়াতুল ইসলাম সিলেট
০৩/০৭/২০২৫
সম্পাদক প্রকাশক : খন্দকার মোঃ বদরুল আলম । কার্যালয়, মার্ভেলাস টাওয়ার দিত্বীয় তলা ১০/১১ নং অফিস সিলেট-গোলাপগঞ্জ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ০১৭২০৫৫৪৫৯০। ই-মেইল : gbbartanews@gmail.com